“আমার যা স্বপ্ন ছিল এবং যার জন্য আমি পরিশ্রম করেছি, ঈশ্বর তা পূর্ণ করেছেন — এবং আমি যা ভেবেছিলাম তার থেকেও বেশি দিয়েছেন। এর কারণ মাউন্ট ওয়াশিংটন কেন্দ্র সব সময় ঈশ্বরের সেই নিমিত্ত হতে চেয়েছে যার জন্য ওই সকল পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়েছে।”
— পরমহংস যোগানন্দ
২০২৫-এ লস অ্যাঞ্জেলস-এর মাউন্ট ওয়াশিংটনের চূড়ায় পরমহংস যোগানন্দের সেল্ফ-রিয়লাইজেশন ফেলোশিপের আন্তর্জাতিক সদর দফতর প্রতিষ্ঠার ১০০ তম বর্ষ পালিত হল। এখানে তিনি ছিলেন, শিক্ষা দিয়েছিলেন এবং ২৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে ঈশ্বর সংযোগ করেছিলেন এবং এই আশ্রম কেন্দ্র থেকেই তাঁর বক্তৃতা, রচনা এবং ভাষণের রেকর্ডিং প্রকাশিত এবং সারা বিশ্বে উপলব্ধ হয়।
লস অ্যাঞ্জেলস শহরের কেন্দ্রের কাছেই অবস্থিত ১২একরের এই সম্পত্তি ভারতবর্ষ থেকে আগত এক তরুণ সন্ন্যাসী কি করে সংগ্রহ করলেন? এই কাহিনী শুরু হয়েছিল ভারতবর্ষে অনেক বছর আগে, কম বয়সে কাশ্মীরে ভ্রমণ করার সময় শঙ্করাচার্যের অতি প্রাচীন মন্দিরের দিকে তাকিয়ে পরমহংস যোগানন্দের এক অতিচেতন অভিজ্ঞতা হয়েছিল। তিনি দেখেছিলেন পাহাড়চূড়ার সেই মন্দির মাউন্ট ওয়াশিংটনের চূড়ায় এক অট্টালিকায় পরিবর্তিত হচ্ছে যেখানে তিনি ভবিষ্যতে তাঁর সদর দফতর প্রতিষ্ঠা করবেন, ভালোবেসে তিনি যাকে বলতেন মাদার সেন্টার। সেই অসাধারণ দর্শনটি এতটাই স্পষ্ট ছিল যে পরমহংসজি পরে স্মৃতিচারণে বলেছেন, তিনি সেই বৃহৎ ভবনের ভিতরের সিঁড়িগুলিও পুঙ্খানুপুঙ্খ দেখেছিলেন।
১৯২৪-এর ডিসেম্বরে, বস্টন এবং পূর্ব উপকূলের অন্যান্য শহরে বহু বছর ধরে শিক্ষা দেওয়ার পরে পরমহংস যোগানন্দ এক অন্তর্মহাদেশীয় বক্তৃতা সফরের শেষে লস অ্যাঞ্জেলসে এসে পৌঁছোন। তাঁর বার্তা পশ্চিম উপকূলবর্তী প্রাণবন্ত শহরগুলিতে সঙ্গে সঙ্গে এক সন্তোষজনক সাড়া ফেলে দেয় এবং শহরের কেন্দ্রস্থলের ফিলহারমোনিক অডিটোরিয়ামে হাজার হাজার মানুষ তাঁর বক্তৃতা শুনতে আসেন। একদিন তিনি তাঁকে যারা সাহায্য করছিলেন এমন কিছু ছাত্রদের বলেছিলেন, “এখানে লস অ্যাঞ্জেলস-এ, দেবদূতদের এই শহরে একটা জায়গা দেখা যাক , যেখানে আমরা একটি কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করতে পারি, আমি এখানে এক অসাধারণ আধ্যাত্মিক স্পন্দন অনুভব করছি।”
তিনি এবং তাঁর ছাত্রদের একটি ছোট্ট দল গাড়ি নিয়ে মাউন্ট ওয়াশিংটনের সিলভান এলাকায় একটি ছোট খাটো সম্পত্তি খুঁজছিলেন এবং ঘটনাক্রমে তাঁরা একটি বিশাল ভবনের সামনে দিয়ে গেলেন যেটি একদা সুরুচিসম্মত মাউন্ট ওয়াশিংটন হোটেল ছিল।
পরমহংস যোগানন্দজি উৎসুক হয়ে ওঠেন এবং জায়গাটি দেখার জন্য তাদের ফিরে যেতে বলেন। তিনি গাড়ি থেকে নেমে সেই ফাঁকা কিন্তু বিশাল ভবনটির সামনে দাঁড়িয়ে, ওপর দিকে তাকিয়ে বললেন, “এই জায়গাটিকে আমাদের নিজের বলে মনে হচ্ছে!”
তাঁর উদার ছাত্রদের বদান্যতায় এবং গুরুদেবের দেওয়া দুটি বন্ধকের বিনিময়ে ১৯২৫-এ সেল্ফ-রিয়লাইজেশন ফেলোশিপ- এর আন্তর্জাতিক সদর দফতরের জন্ম হয়। আধ্যাত্মিক কাজের জন্যে একটি স্থায়ী ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় পরমহংস যোগানন্দজি আরও বেশি সংখ্যায় সত্য অনুসন্ধানীদের কাছে পৌঁছোতে পেরেছিলেন।
পরমহংসজির তত্ত্বাবধানে সেই স্থানটি এক প্রশান্তির স্বর্গ হয়ে উঠেছিল, উদ্যানের মতো প্রাঙ্গন, রাজকীয় বনস্পতি এবং ধ্যান উদ্যান — কোলাহলপূর্ণ লস অ্যাঞ্জেলস শহরের বুকে যেন শান্তি ও সম্প্রীতির এক নিবাসস্থল। মাদার সেন্টারে তাঁর আবাসস্থল এখনও তীর্থস্থানের মতো সংরক্ষিত রয়েছে এবং লাইব্রেরি ও অভ্যর্থনা কক্ষে তাঁর ব্যক্তিগত ব্যবহার্য কিছু বস্তু প্রদর্শন করা আছে। যে প্রার্থনাগৃহে তিনি সারা বছর প্রার্থনা পরিচালনা করতেন তা প্রতিদিন প্রার্থনা ও ধ্যানের জন্য খোলা থাকে আর এক সুন্দর বহির্ভাগ “টেম্পল অফ লিভস” যেখানে তিনি প্রায়ই ক্লাস নিতেন সেটিও যেন প্রশান্ত উপাসনার আমন্ত্রণ জানায়।
পরমহংসজির দিব্য চেতনার শক্তিশালী স্পন্দন যা এসআরএফ-এর সদর দফতরের উদ্যানে পরিব্যাপ্ত থাকে, যারা মন থেকে গ্রহণ করার ভাব নিয়ে সেখানে আসেন তাঁরা তাঁদের জীবনে এর রূপান্তরকারী প্রভাব সম্পর্কে সাক্ষ্য দিয়েছেন।
আপনারা হয়তো জানেন, ২০২৪-এর মার্চ মাসে এসআরএফ আন্তর্জাতিক সদর দফতরের আধুনিকীকরণ এবং পুনর্বাসনের জন্য আমরা লস অ্যাঞ্জেলস শহরের কাছে এক পরিকল্পনা জমা দিয়েছি যা পরমহংসজির প্রিয় মাদার সেন্টারকে আগামী ১০০বছর ও তার পরবর্তী সময়ের জন্য প্রস্তুত করবে। এছাড়া আন্তর্জাতিক সদর দফতর ভবনটির ভূকম্পনঘটিত এবং জীবন-সুরক্ষা বিষয়ক জরুরি ব্যবস্থার উন্নতি সাধন সহ এই পরিকল্পনাটিতে পরমহংস যোগানন্দের প্রতি শ্রদ্ধা স্বরূপ একটি ছোটো উদ্যানসহ মন্দিরও থাকবে। আমরা এই শহরে অনুমতির পদ্ধতি অনুযায়ী কাজ চালিয়ে যাচ্ছি এবং আগামী কিছু মাসের মধ্যে আপনাদের এই পরিকল্পনার বিষয়ে আরও সাম্প্রতিকতম তথ্য ভাগ করে নেওয়ার অপেক্ষায় আছি।
আমরা আপনাদের এসআরএফ মাদার সেন্টারে একটি প্রতিবিম্বিত চিত্রের তীর্থযাত্রায় আসার আমন্ত্রণ জানাচ্ছি, যেটি পরমহংসজির হৃদয়ের প্রিয় এবং বিশ্বজনীন যোগবিজ্ঞানকে সকলের কাছে পৌঁছে দেওয়া তাঁর মিশনের মূল উদ্দেশ্য।


















