নিচের পোস্টটি “মানসিক স্থবিরতা কি ভাবে কাটিয়ে ওঠা যাবে” বক্তৃতার অংশ বিশেষ যা পরমহংস যোগানন্দের সংগৃহীত আলোচনা এবং প্রবন্ধের চতুর্থ খণ্ডের জীবনের রহস্য সমাধান বিভাগে সম্পূর্ণরূপে পড়া যাবে। শীঘ্রই এটি সেল্ফ-রিয়লাইজেশন ফেলোশিপ দ্বারা এবং পরে যোগদা সৎসঙ্গ সোসাইটি অফ ইন্ডিয়া থেকে প্রকাশিত হবে। ১৯৪০-এর ১৪ই জুলাই ক্যালিফোর্নিয়ার এনসিনিটাসে সেল্ফ-রিয়লাইজেশন ফেলোশিপ গোল্ডেন লোটাস টেম্পলে এই বক্তৃতাটি দেওয়া হয়।
পৃথিবীতে আমাদের প্রধান কর্তব্য হল, আমাদের মরণশীল সত্তাকে ঐশ্বরিক সত্তায় রূপান্তরিত করা। কিন্তু এই পৃথিবী তো আমাদের মনোযোগ আকর্ষণকারী নানারকম ঝকমকে লোভনীয় খেলনায় ভরা — বিভিন্ন উপায়ে এরা আমাদের চিন্তাধারাকে এবং আচার আচরণকে কামনা-বাসনার সংকীর্ণ পথে প্রবাহিত করে।
জ্ঞানের দ্বারা পরিচালিত না হলে, আমরা এই সংকীর্ণ পথে আটকা পড়ে যাই এবং আত্মার উন্নতিতে এগিয়ে যেতে পারি না। যখন আমরা আমাদের সমস্ত আকাঙ্ক্ষার মধ্যে ঐশ্বরিক সাধনাকে সর্বাগ্রে বিবেচনা করি, তখনই আমরা স্থায়ী সুখের পথ খুঁজে পাই।
জীবনের অগ্রগতিকে বিশ্লেষণ করে দেখো: তুমি কি এই ধরণের মানসিক স্থবিরতায় ভুগছ?
কর্দমাক্ত রাস্তায় গাড়ি চালাতে গিয়ে যদি তোমার গাড়ি কাদায় আটকে যায়, তখন গাড়িকে টেনে তুলে আনতে প্রয়োজন দক্ষ পরিচালনা — হয়তো বা একটা টো ট্রাক! সেইরকম, মানসিক স্থবিরতা থেকে মানবসমাজকে মুক্ত করতে আমাদের বিশেষ মনঃসংযোগের প্রয়োজন।
তোমাদের প্রত্যেকের উচিত নিজ জীবনের অগ্রগতিকে পর্যায়ক্রমে বিশ্লেষণ করে দেখা যে, তুমি কোনো মানসিক সমস্যায় আটকে আছো কিনা। প্রথমে নিজেকে জিজ্ঞাসা করো তুমি কোন রাস্তায় চলেছ। তুমি কি এমন একটি মসৃণ, আলোকিত রাজপথে ভ্রমণ করছ যা তোমাকে অবশ্যই তোমার জীবনের গন্তব্যে নিয়ে যাবে?…
আবার এমন ও হতে পারে, যে তুমি জীবনকে সঠিকভাবে পরিচালনা করছ না। যদি তুমি নিজের ওপর খুব বেশি আত্মবিশ্বাসী হও এবং অসাবধানতাবশত রাস্তা ঠিকমত খেয়াল না কর, তাহলে নিজেই পথভ্রষ্ট হয়ে রাস্তার ধারে কোনো গর্তের মধ্যে পড়ে যেতে পারো।
নশ্বর জীবনের যে কোনো পথেই মানুষ মানসিক জটিলতায় আটকা পড়তে পারে; মানুষের চেতনাকে আঁকড়ে ধরার জন্য তারা সর্বত্র উপস্থিত থাকে। স্থবির মানসিকতা কখনও তোমার অনুভূতিকে বাধ্য করে অহেতুক রাগ করতে, কখনও বা হতাশার মানসিকতায় আটকে রাখে; আবার কখনও লোভ, ঈর্ষা বা অতিরিক্ত সমালোচনামূলক হওয়ার স্থায়ী অভ্যাসে আটকে রাখতে পারে, এই রকম সব।…
ঠিক যেমন, যখন একটি গাড়ি কাদা বা বালিতে আটকে যায় এবং চালক অ্যাক্সিলারেটরে পা রাখে, যার ফলে চাকা দ্রুত ঘুরতে থাকে, কিন্তু গাড়ি একই জায়গায় থাকে — অনেক মানুষের অবস্থাও তাই। তাদের জীবনের ইঞ্জিন চললেও, তাদের চাকা অকেজোভাবে ঘুরছে। এই ধরনের ব্যক্তিদের অগ্রগতি এবং বৃদ্ধি নগণ্য। তারা মনে করে যে তাদের শরীর পরিণত হয়েছে বলে তারা বড় হয়েছে, কিন্তু তাদের মস্তিষ্ক, তাদের মন, তাদের মনোভাবের কোনো পরিবর্তন হয় না — মানসিক এবং আধ্যাত্মিকভাবে তারা অপরিণতই থাকে।
মানসিক অস্থিরতা থেকে বেরিয়ে আসার এক সুন্দর উপায় আছে। সবার থেকে দূরে এক শান্ত জায়গায় বসে নিজের সাথে শান্তভাবে কথা বলো। কীভাবে তুমি তোমার জীবনকে আরও অর্থবহ এবং আকর্ষণীয় করে তুলতে পারবে, নিজেকে উন্নত করার সেই উপায়গুলি সম্পর্কে ভাবো।
সবচেয়ে ভালো উপায় হল, ঈশ্বরের উপস্থিতিকে তোমার জীবনে আরও অনুশীলন করে তাঁর সাথে আরও গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলা। তুমি যা করছ, তা অন্যদের বলার প্রয়োজন নেই। কেবল অন্তরে ঈশ্বরের সাথে থাকো।
তিনি সকল শান্তির, সকল সুখের উৎস। তিনি নিত্য নতুন আনন্দ। তাঁকে জানলে পর, তোমার জীবন আর একঘেয়ে থাকবে না। তোমার চেতনায় সর্বদা নতুন নতুন অনুপ্রেরণার চিন্তা প্রবাহিত হবে।
যখন তুমি “মানসিক আসবাবপত্র” গোছের মানুষদের দেখো, যাদের মধ্যে কোনো সদর্থক পরিবর্তন দেখা যায় না, তখন তুমি ভাবো: “আমি ওদের মতো হতে চাই না!”
আমি বোস্টনে এমন একজনকে জানতাম। সে ছিল অসাধারণ আত্মা, অত্যন্ত পরিশীলিত এবং বুদ্ধিমতী। কিন্তু তার কিছু নেতিবাচক বৈশিষ্ট্য ছিল। সে একই ভয় নিয়ে চিন্তা করত, একই নেতিবাচক ধারণা এবং অদ্ভুততা নিয়ে প্রতিক্রিয়া দেখাত, যা পনের বছর আগে তার মধ্যে ছিল।
তুমি যেন এমন নেতিবাচকতায় শুষ্ক হয়ে যেও না। তুমি প্রাণ প্রাচুর্যে ভরে থাকতে চাও, মৃত কাষ্ঠখণ্ডের মতো নয়! উদাহরণস্বরূপ, যদি তুমি কোনো এক পুরোনো গোলাপের ঝোপের সমস্ত মৃত ডালপালা কেটে তাতে জল ঢালো এবং তার যত্ন নাও, তাহলে ধীরে ধীরে ঝোপের মধ্য দিয়ে প্রাণশক্তি প্রবাহিত হতে শুরু করে এবং ছোটো ছোটো পাতা বের হতে শুরু করবে, তারপর সূর্যের আলো ঝোপের ওপর পড়ার সাথে সাথে, সুন্দর সুন্দর কুঁড়ি দেখা দেবে। সঠিক যত্নের সাথে, এটি প্রস্ফুটিত হয়ে, তার সৌন্দর্য এবং সুবাস দিয়ে আমাদের আনন্দ দেবে।
তুমিও এরকম হতে পারো। তোমার অগ্রগতিকে পঙ্গু করে দিয়েছে এবং তোমাকে অকেজো করে দিয়েছে এমন সমস্ত পুরনো অভ্যাস থেকে নিজেকে মুক্ত করো। ক্রমাগত শরীর, মন এবং আত্মায় নতুন অভিজ্ঞতা, নতুন গুণাবলী, নতুন উন্নতির পাতা এবং ফুল ফোটাও।
যখন পরীক্ষার শীত আসে, তখন জীবনের কিছু পাতা ঝরে পড়ে। এটা স্বাভাবিক। এটা কোনো ব্যাপার না। ধীরে ধীরে এগিয়ে যাও। বল, “বিচলিত হবো না, গ্রীষ্ম আসছে এবং আমি আবার ফুলে ফুলে ভরে উঠব।” ঈশ্বর গাছকে প্রবল শীতের মধ্যেও বেঁচে থাকার অভ্যন্তরীণ শক্তি দিয়েছেন। তোমার ক্ষমতাও কিছু কম নয়।
জীবনের শীতকাল তোমাকে ধ্বংস করতে আসে না, বরং তোমাকে নতুন উদ্যম এবং গঠনমূলক প্রচেষ্টায় উদ্দীপিত করতে আসে, যা প্রস্ফুটিত হয়ে সকলের জন্য নতুন সুযোগরূপী বসন্তের সূচনা করে।
তোমাকে নিজেকে বলতে হবে, “আমার জীবনের এই শীতকাল চিরকাল থাকবে না। আমি নিশ্চয় এই পরীক্ষার হাত থেকে বেরিয়ে আসব, নতুন পাতা জন্মাবে, উন্নতির ফুল ফুটবে, আবারও স্বর্গের পাখি আমার জীবনের ডালে এসে বসবে।”
উদাহরণস্বরূপ, যদি তুমি দেখতে পাও যে তুমি স্নায়ুদৌর্বল্য, হজমের সমস্যা বা অন্য কোনো চাপে ভুগছ, তাহলে এর জন্য গঠনমূলক কিছু করো। এতে কিছুসময় কষ্ট পেলেও, যদি তুমি অসহায়তাকে প্রশ্রয় না দাও, তাহলে সব ঠিক হয়ে যাবে।
দীর্ঘস্থায়ী রোগ হল একধরণের মানসিক সীমাবদ্ধতা, যা থেকে তুমি কখনই বেরিয়ে আসতে পারবে না বলে মনে কর। অসুস্থতা বা সীমাবদ্ধতার কোনো ভাবনাই মনে আনা ঠিক নয়। স্বাভাবিকভাবেই, এটা ভাবা অবাস্তব যে শরীর সবসময় একই থাকবে; এটিকে দীর্ঘ সময় ধরে ভালো রাখা যেতে পারে, কিন্তু অবশেষে এটি বৃদ্ধ হয়ে দুর্বল হয়ে পড়বে। তবে এর অর্থ এই নয় যে মনের কাছে হার মানতে হবে, মনকে মুক্ত রাখতে হবে।
নিজ দেহকে বহিঃদৃষ্টিতে বৃদ্ধ মনে হলেও চোখ বন্ধ করে যদি তোমার আসল সত্তার দিকে তাকাও, দেখবে যে তুমিই আত্মা। জীবনের বাইরের খোলস থেকে চোখ সরিয়ে অন্তরাত্মার চোখ দিয়ে দেখ, মৃত্যু নেই, কোনো বার্ধক্য নেই, নেই কোনো বস্তুগত সীমাবদ্ধতা।
তুমি এক পবিত্র আত্মা। প্রতি রাতে গভীর ঘুমের স্বাধীনতায় তুমি আসলে নিজেকে সেই রূপেই দেখতে পাও, কারণ তোমার কোনো রূপ নেই, শরীরের কোনো ভর নেই, পুরুষ বা মহিলা হওয়ার কোনো চেতনা নেই, অথবা কোনো নির্দিষ্ট ধরণের ব্যক্তিত্ব নেই। সজাগতা মানসিক স্থবিরতাকে অতিক্রম করে। এই অবস্থা নিয়ন্ত্রণ করলে জড়গত জীবনের বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়া যায়। ঘুম হল এক অচেতন অবকাশ; এবং এর প্রভাব ক্ষণস্থায়ী। গভীর ধ্যানের অতীন্দ্রিয় নীরবতা হল তোমার চেতনাকে স্থায়ীভাবে মুক্ত করার একমাত্র উপায়। ধ্যানের মাধ্যমে তুমি সবসময় অন্তরে সচেতন স্বাধীনতা বজায় রাখতে শেখো।
দিনের শেষে, ধ্যানে স্থির হয়ে বসে সারাদিনের কাজকর্ম সংক্ষেপে বিশ্লেষণ কর। তারপর দৃঢ় চিত্তে মানসিকভাবে সংকল্প কর, “আমি সমস্ত বাধা থেকে মুক্ত, সমস্ত সীমাবদ্ধ চিন্তাভাবনা এবং অভিজ্ঞতা থেকে মুক্ত। আমি ঈশ্বরের আনন্দময়, সীমাহীন শান্তিতে বিশ্রাম নিচ্ছি।” এই সময়ে অতীব সুখানুভূতি হয়। এই সময়ের আনন্দকে কোনো ভাষায় বর্ণনা করা যায় না।
কিন্তু বেশিরভাগ মানুষই চেষ্টা করে না। তাদের অগ্রাধিকার হল পার্থিব বস্তুর পিছনে ছুটে বেড়ান। এবং তারা মনে করে যে তারা বেঁচে আছে কারণ, তাদের হৃদয় স্পন্দিত হচ্ছে এবং শ্বাস প্রবাহিত হচ্ছে। কিন্তু এটি বেঁচে থাকা নয়; এটি কেবল অস্তিত্ব। জীবনের পথে তাদের সাফল্যের চাকা বালির খাদে আটকে গেছে।
যদি তুমি সেই অবস্থায় থাকো, তাহলে হঠাৎ করে অন্তস্থিত মহাশক্তির বিস্ফোরণ ঘটিয়ে তোমার জীবনের গাড়িকে খাদ থেকে উঠিয়ে অবিচল অগ্রগতির প্রবহমান রাজপথে চালিত করো। তারপর চিত্তবিক্ষেপের আরও খাদ এড়িয়ে মহা গর্জনে এগিয়ে চল, যতক্ষণ না তুমি ঈশ্বর উপলব্ধির বিশাল, সুন্দর দৃশ্যে পৌঁছোও — যা সুখ, শান্তি, প্রশান্তির — আর তুমি সেখানে বিশ্রাম নিতে পারো।
এই দৃশ্য বাস্তব। কল্পনা নয়। কিন্তু সেখানে পৌঁছোনর জন্য তোমাকে ধ্যানলব্ধ গভীর নীরবতায় প্রবেশ করতে হবে। অন্তরের সেই নীরবতায়, নশ্বর চিন্তামুক্ত হয়ে তুমি দেখতে পাবে যে তোমার আত্মা সমস্ত মানসিক স্থবিরতা থেকে মুক্ত।


















